সোনার পিসিমণির আগমনবার্তা: টিকে থাকার এক দুর্দান্ত লড়াই
Sat Dec 27 2025

🚨 অস্পষ্টতার সংকট (আমার মাথা কাজ করছে না!)
জিনিয়াস হওয়ার সমস্যা হলো, আমাকে অগোছালো থাকার সুযোগ খুব কমই দেওয়া হয়। আর আমার সমস্যাটা হলো, আমি ছিলাম একটা জীবন্ত, শ্রুতিগম্য, দৃশ্যমান এবং ভীষণ জোরালোভাবে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা।
আমার ঘরটা কোনো ঘর ছিল না; এটা ছিল ১০০টা ট্যাব খুলে রাখা একটা ইন্টারনেট ব্রাউজারের বাস্তব রূপ — কোনো কিছুই সঠিক জায়গায় ছিল না, আর পুরো ব্যবস্থাটা যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। আমার কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিকতা।
অন্তত গতকাল পর্যন্ত।
“পিসিমণি কিন্তু একটা জ্যান্ত অডিটর, তুই মিলিয়ে নিস,” আমি বিড়বিড় করতে করতে দুই সপ্তাহের জমানো কাপড়চোপড় কম্পিউটারের পেছনে ঠুসে দিচ্ছিলাম।
“কার্নেল, পিসিমণি যেন এসব না দেখে! নাহলে দেখবি এই ঘর দেখিয়েই প্রমাণ করে দেবে যে আমি একটা ঠিকঠাক প্রাপ্তবয়স্ক জীবন কাটানোর অনুপযোগী। পিসিমণি আসার আগেই আমাকে কিছু একটা করতে হবে।”
কার্নেল দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। “তোকে একটু মনে করিয়ে দিই, উনি তিন ঘণ্টার মধ্যেই আসছেন বাচ্চাদের নিয়ে যেতে।”
“মাত্র তিন ঘন্টায় আমি এতো জিনিস কিকরে গুছাবো?” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
“অসম্ভব! আমি সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে? দেখ, এই মোজাগুলোর দিকে তাকা! একটা ফুটো হয়ে গেছে, তাই ফেলে দেওয়া উচিত। কিন্তু, আমার প্রথম হ্যাকাথনে (Hackathon) আমি এগুলো পরেছিলাম! তাহলে রেখে দেওয়া উচিত তাইনা?”
“যেটায় তুই হেরে গেছিলি?”
“চুপ কর! জেতা বা হারা বড় কথা নয় — অভিজ্ঞতাটাই আসল!”
আমি কার্নেলের ভাবলেশহীন চাউনি উপেক্ষা করে বলে চললাম,
“আর এই টুপিটা—এটা পরে আমি আমার প্রথম ক্রাশকে দেখেছিলাম! আর এই গ্রে টি-শার্টটা? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড দিয়েছিল। তখন এটা কালো ছিল! আর এই গেঞ্জিটা অনেক পুরোনো, কিন্তু এটা আবার লাল! আমার প্রিয় রং! আর—”
কার্নেল আমাকে কথার মাঝখনেই থামিয়ে দিল, বরাবরের মতোই নিষ্ঠুরভাবে বাস্তববাদী ও।
“দাঁড়া। তোকে শুধু সিদ্ধান্ত নিতে হবে ওটা রাখবি নাকি দান করে দিবি। আর হ্যাঁ, আন্টি কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে ঠিক ধরে ফেলবেন যে এই ঘরে ব্যবহারের মতো জায়গা মাত্র ১০ শতাংশ। তোকে এই ‘প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন’ পরিষ্কার করতেই হবে।”
ওর বিরক্তিকর শান্ত হাসিটা আমার মেজাজ খারাপ করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
“দূর হো তো। আমায় ভাবতে দে।”
কার্নেলের হাসিটা আরো প্রশস্ত হয়ে গেলো। “অবশ্যই। তবে তার আগে, ছোট্ট একটা উপকার করতে হবে…”
(নিচের হলঘরের দিকে ইশারা করল ও।)
“আমি বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আর এই খুদে শয়তানগুলোকে সামলানোর দায়িত্ব তোর। হ্যাভ ফান!”
আমি ওর দিকে তাকালাম, ঠিক যেন মীরজাফরের প্রতিচ্ছবি।
“তুই কথা দিয়েছিলি কার্নেল! আমি একসাথে ঘর পরিষ্কার আর চারটে হিউম্যান ডায়নামোকে সামলাতে পারব না!”
কার্নেল হাত নেড়ে বিদায় জানাতে জানাতে হাঁটতে শুরু করল। “তুই ঠিক ম্যানেজ করে নিবি! আমি জানি। পরিষ্কার করার মূল নীতিটা মনে রাখিস: বিশ্লেষণ কম কাজ বেশি। টাটা!”
আর এইভাবেই, ও আমায়, আমার সিদ্ধান্তহীনতার পাহাড়ের মাঝখানে একা ফেলে রেখে চলে গেলো — আর দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম আমার চারটে পুচকে ভাই বোন নিচের ড্রয়িংরুমটাকে ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে।
💡 দ্বিমূল সন্ধিক্ষণ: কেন শুধু ১ আর ০?
আমি আমার হাতের ফুটোওয়ালা হ্যাকাথন মোজাটার দিকে তাকালাম, তারপর তাকালাম “হয়তো রাখা উচিত”-এর পাহাড়সমান স্তূপের দিকে।
এটা ঠিক আলসেমি নয়; এটা ছিল অস্পষ্টতা ঘটিত অসাড়তা। একটা ডিসিশন-মেকিং সিস্টেম ফেইলিওর।
আমি গভীর শ্বাস নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কার্নেলের শেষ কথাটা আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।
“বিশ্লেষণ কম, কাজ বেশি!”
আমি হাল ছেড়ে দিতেই যাচ্ছিলাম, তখনই মাথায় একটা বুদ্ধি এল: হ্যাঁ, ঠিক তো।
আমি একটা এক্সেল শিট খুলে ফেললাম এবং নতুন উদ্যমে টাইপ করা শুরু করলাম।
আমার ব্রেন যদি ভেরিএবেল চায়, তবে আমি এই বিশৃঙ্খলাকেই অংকের হিসেবে ফেলব:
- আগ্রহের বস্তু
- আবেগীয় মূল্য (পূর্ণমান ৫০)
- ব্যবহারযোগ্যতা (পূর্ণমান ৫০)
- মোট সাফল্যাঙ্ক (%)
- আর শেষ বর্গটার নাম আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে দিলাম— ভোল্টেজ
| আগ্রহের বস্তু | আবেগীয় মূল্য (পূর্ণমান ৫০) | ব্যবহারযোগ্যতা (পূর্ণমান ৫০) | মোট সাফল্যাঙ্ক (%) | ভোল্টেজ |
|---|---|---|---|---|
| মোজা | ৪৫ (প্রথম হ্যাকাথন) | ১০ (ফুটো আছে) | ৫৫% | ০.৫৫ |
| শার্ট | ৫০ (কারণ এটা লাল) | ২০ (খুব পুরোনো) | ৭০% | ০.৭০ |
| টুপি | ৩৫ (প্রথম ক্রাশকে দেখার স্মৃতি) | ২০ (রং চটে গেছে) | ৫৫% | ০.৫৫ |
| … | … | … | … | … |
আমি জিনিসের তালিকা করেই যাচ্ছিলাম — কিন্তু এই এক্সেল শিটটা শুধু সন্দেহই বাড়াচ্ছিল।
মোজা আর টুপি দুটোই ০.৫৫ ভোল্টেজে এসে থেমেছে, কিন্তু মনে মনে টুপিটার ভোল্টেজ বেশি ঠেকছে।
আর যদি কোনো জিনিস রাখার জন্য নূন্যতম ভোল্টেজ ০.৬০ ভোল্ট হয়… তবে কি আমি ০.৫৫ এর পরবর্তী আসন্নমান নেবো নাকি পূর্ববর্তী আসন্নমান নেবো?
এই সাবজেক্টিভ স্কেলিংই ছিল আমার পতনের কারণ।
হঠাৎ করেই, চারটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ঝড়— অডি, ফ্লপি, কোডেক্স, এবং এনিগমা —চিৎকার করতে করতে ঘরে ঢুকে পড়ল। আমার অগোছালো ঘর দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া।
“ওই দেখ! পাহাড়!” চিৎকার করে কোডেক্স সেই স্তূপের ওপর ঝাঁপ দিল, বাকিরাও তাকে অনুসরণ করল। মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে ঘরটা ‘নিষ্ক্রিয় বিশৃঙ্খলা’ থেকে ‘সক্রিয় দুর্যোগ’-এ পরিণত হলো।
আতঙ্কিত হয়ে আমি আমার ফোনটা আঁকড়ে ধরলাম — ওই ভীতুর ডিম বিশ্বাসঘাতকটাকে যোগাযোগ করার একমাত্র উপায়, যে আমাকে ফেলে পালিয়েছে।
(ফোনে)
“কার্নেল! ওরা উড়ছে, ছুটছে, লাফাচ্ছে! ওরা সব প্রমাণ নষ্ট করে ফেলছে! আমার হিসাব মিলছে না! আমার কাছে ০.৫৫ ভোল্ট আর ০.৭০ ভোল্টের জিনিস আছে, কিন্তু আমি যদি ন্যূনতম মান মানে থ্রেশহোল্ড ০.৬০ ভোল্ট সেট করি, তবে সামান্য গোলমালে—একটু আবেগ বা স্মৃতি মনে পড়লেই—০.৫৫ ভোল্টকে ০.৬০ ভোল্টের মতো মনে হতে পারে! আমি সমস্ত নিশ্চয়তা হারিয়ে ফেলছি! যখন ঝুঁকি এত বেশি, তখন আমি এই অবিচ্ছিন্ন মানগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারছি না!”
অন্যদিকে, এনিগমা আমার টেবিল ল্যাম্পটা আবিষ্কার করল। সে একটা চেয়ারে উঠে উন্মাদনার সাথে ল্যাম্পের সুইচটা টিপতে শুরু করল।
ক্লিক। ক্ল্যাক। অন। অফ। অন। অফ।
কার্নেল (ট্রাফিক আর এনিগমার ক্লিকের আওয়াজ ছাপিয়ে শান্ত গলায়):
“নোভী, ভোল্টেজ গোনা বন্ধ কর। বাচ্চাদের একটা ড্রয়িং খাতা দে আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস গুলো ফেলে দে। তুই ব্যাপারটাকে বেশি জটিল করে ফেলছিস। আসল লক্ষ্যের দিকে মন দে। ঘর পরিষ্কার কর।”
আবার সেই মেজাজ খারাপ করা সরলতা — লক্ষ্যের দিকে ফোকাস কর — আর তার সাথে ল্যাম্পের ওই একটানা ‘ক্লিক-ক্ল্যাক’ শব্দে হঠাৎ সবকিছু আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
(আমার চোখ বড় হয়ে গেল, এক্সেল শিটটা এখন আমার কাছে আবর্জনা মনে হচ্ছে)
“… পেয়ে গেছি! আসল লক্ষটা প্রয়োজনীয়তা মাপা নয় — লক্ষ্য হলো সিদ্ধান্ত নেওয়া! আমার পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে কারণ এটা অ্যানালগ — এখানে বড্ড বেশি অবিচ্ছিন্ন মান!”
কার্নেল:
“ভালো লাগছে শুনে যে তুই বোঝার চেষ্টা করছিস, কিন্তু আমি এখনও বুঝলাম না তুই কী—”
(আমি কর্নেল কে থামিয়ে দিলাম, এনিগমার অন-অফ-অন-অফ শব্দের মাঝে হঠাৎ মনে হলো আমার মাথায় ও একটা আলো খেলে গেলো।)
“আমার এমন একটা সিস্টেম দরকার যার মাত্র দুটো অবস্থা আছে, কারণ দুটো অবস্থা সবসময় নির্ভরযোগ্য! হাই ভোল্টেজ (১) অথবা লো ভোল্টেজ (০)। এর মাঝখানের সবকিছুই হলো গোলমেলে অর্থাৎ নয়েজ। আমাকে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে খাঁটি দ্বিমূল সিদ্ধান্তে মানে বাইনারিতে ভাঙতে হবে!”
সে কিছু বলার আগেই আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
কচিকাঁচারা আমার হঠাৎ ‘বাইনারি’ ঘোষণা শুনে চমকে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেল।
আর আমি সেখানে দাঁড়িয়ে — অবশেষে বুঝতে পারলাম কী করতে হবে: আমার ১ আর ০ দরকার। এখন আমাকে শুধু বুঝতে হবে সেটা কীভাবে করবো।
🏃 কার্নেলের বোধোদয় এবং প্রত্যাবর্তন
(এই ফাঁকে কর্নেলের ওদিকে…)
কার্নেল ফোনটা নামিয়ে রাখতে রাখতে একটু চিন্তামগ্ন হয়ে উঠলো, কানে তখনও নোভীর বাইনারি ঘোষণাটা ভাসছে।
ভোল্টেজ লেভেল? থ্রেশহোল্ড? অবিচ্ছিন্ন মান?
ও তো মোজার ড্রয়ার নিয়ে কথা বলছিল, সার্কিট বোর্ড নিয়ে নয়। শুনে মনে হলো ও মোম রং দিয়ে মাদারবোর্ড বানাতে যাচ্ছে।
কার্নেলের কেমন একটা অস্বস্তি হলো। অপরাধবোধ এসে তাকে কানে কানে যেন বলল, “নোভীকে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে, ওর ঐরকম মানসিক অবস্থায়, একা ফেলে চলে এলি? কাজটা ঠিক করলি তো?”
এখন ওর মনে হতে লাগলো “বিশ্লেষণ কম কাজ বেশি” উপদেশটা একটু বেশিই কঠোর ছিল।
“হয়তো ওকে একা রেখে এসে আমিই পরিস্থিতিটা জটিল করে ফেলেছি,” কার্নেল মনে মনে স্বীকার করল।
সে ঘড়ি দেখল। সে মাত্র চল্লিশ মিনিট বাইরে—কিন্তু নোভীর জন্য এই চল্লিশ মিনিট মানে ভূমিকম্পের সময় কোনো হাই-ভোল্টেজ ল্যাবের ভেতর আটকে থাকার সমান।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি ঘোরাল, ইউ-টার্ন নিল।
ওকে নিশ্চিত হতে হবে যে নোভী সত্যিই বাচ্চাদের ইলেকট্রিক প্লাগের সাথে ওয়্যারিং করা শুরু করেনি তো!
মারাত্মক ট্রাফিক আর নিজের বাড়তে থাকা আতঙ্ক কাটিয়ে কার্নেল অবশেষে বাড়ি পৌঁছাল। সে নিঃশব্দে গাড়ি পার্ক করে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমটা একদম শান্ত। বড্ড বেশি শান্ত।
তার উদ্বেগ আরো বেড়ে গেল।
হোস্টেজ সিচুয়েশন? বৈদ্যুতিক আগুন? আন্টি কি আগেই চলে এসেছেন এবং নোভীকে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন?
সে দুটো করে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ওপরে উঠল এবং নোভীর ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল — মনকে প্রস্তুত করে ফেলেছিল কান্না, পোড়া দাগ আর টোটাল সিস্টেম ফেইলিওর দেখার জন্য।
🤯 মূল সত্যের উন্মোচন
একই মুহূর্তে, আমার এদিকে…
কার্নেল দরজা খুলতেই আমি সেদিকে তাকালাম। ঘরটা ইতিমধ্যেই রূপবদল করেছে… যেটাকে, বলা যায় ‘অর্গানাইজড ক্যাওস’ বা গোছানো বিশৃঙ্খলায়, কিন্তু সত্যি বলতে বেশ গোছানোই।
মেঝে প্রায় সবটাই পরিষ্কার। বাচ্চারা মারামারি করছে না — ওরা একটা ছোট কারখানার কর্মীদের মতো গুরুগম্ভীর হয়ে কাজ করছে।
- ফ্লপি একটা নোটবুক থেকে কড়া গলায় নিয়ম পড়ছে।
- কোডেক্স আর এনিগমা লাফাচ্ছে, কিন্তু সেটা শুধু দেওয়ালে হাতে লেখা “১” বা “০” কার্ড সাঁটানোর জন্য।
- অডি খুব দক্ষতার সাথে একটা লম্বা লাঠি গোছের গ্র্যাবার দিয়ে, মাঝখানের স্তূপ থেকে জিনিস তুলে সঠিক ঝুড়িতে ফেলছে।
আর আমি?
…আমি আমার ডেস্কে বসে আছি একজন ছোটখাটো জেনারেলের মতো, পুরো অপারেশনটা পরিচালনা করছি।
“নেক্সট আইটেম! অডি, ইনপুট কমপ্লিট! ফ্লপি, রুল ৩-বিটা পড়ে শোনাও! কোডেক্স, ট্রু না ফলস্? এনিগমা, স্কোরটা বলো!” আমি আদেশ দিলাম।
“জিরো! ট্র্যাশ!” কোডেক্স আর এনিগমা একসাথে চিৎকার করে উঠল, আর দুমড়ানো জিনিসটা উড়ে গিয়ে ‘০’ লেখা বাস্কেটে পড়ল।
কার্নেল দৃশ্যটা দেখে এমনভাবে চোখ পিটপিট করল যেন সে কোনো অজানা দুনিয়ায় এসে পড়েছে।
“এসব কী হচ্ছে?”
অডি থামল এবং তার দিকে তাকাল, একদম কনসালট্যান্ট-লেভেলের গাম্ভীর্য নিয়ে।
“আমরা আউটপুট প্রোটোকলস ইমপ্লিমেন্ট করছি।”
ফ্লপি এগিয়ে এল এবং যোগ করল,
“কার্নেল দাদা, তুমি যে অস্পষ্টতার ঝঞ্ঝাট ফেলে পালিয়েছিলে, সেটা সামলাতে আমরা সংরক্ষিত ইনস্ট্রাকশনগুলো অ্যাক্সেস করছি।”
আমি হাসি চাপার চেষ্টা করলাম। কথাটা কার্নেলের গায়ে যতটা লাগার কথা, তার চেয়ে একটু বেশিই লাগল।
কার্নেল আমার দিকে বিভ্রান্ত হয়ে তাকাল।
“তুই এক ঘণ্টা আগে ভোল্টেজ লেভেল আর কনফিউশন নিয়ে কথা বলছিলি। আর এখন তুই একটা কমান্ড সেন্টার বানিয়ে ফেলেছিস। কীভাবে?”
আমি হাসলাম — সেই বিপজ্জনক, আত্মবিশ্বাসী হাসি যা কার্নেলকে সবসময় সতর্ক করে দেয় যে সে এখন একটা হাইলি ডিটেইলড টেকনিক্যাল ব্যাখ্যা শুনতে যাচ্ছে… সেটা ও চাক বা না চাক।
🧠 ফিরে দেখা: ডিজিটাল নকশার জাদু
“বসে পড়, কার্নেল,” আমি মেঝের একমাত্র পরিষ্কার জায়গাটা দেখিয়ে বললাম। “তুই বলেছিলি ‘বিশ্লেষণ কম কাজ বেশি’, কিন্তু সত্যিটা হলো: নির্ভরযোগ্য কাজ করার জন্য আমার প্রথমে দরকার ছিল এমন একটা সিস্টেম যা সম্পূর্ণ নিশ্চয়তার ওপর তৈরি।”
আমি আমার দুমড়ানো এক্সেল প্রিন্ট-আউটটা একটা অপরাধের প্রমাণের মতো তুলে ধরলাম।
“আমি এটার ফাঁদে পড়েছিলাম। আমি একটা কন্টিনিউয়াস, অ্যানালগ সিস্টেম ব্যবহার করে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম — যেমন ০.৫৫ ভোল্ট বা ০.৭০ ভোল্ট। কিন্তু অ্যানালগ ভ্যালুর ক্ষেত্রে ০ আর ১ এর মাঝে অসীম সংখ্যক ভ্যালু থাকে। ওগুলো নড়বড়ে। ওগুলো কাঁপে। ওগুলো আমার মতোই ইমোশনাল হয়ে পড়ে।”
কার্নেল ব্যঙ্গ করে বলল, “হ্যাঁ, কারণ তোর মোজাটা হয়তো ০.৫৫১২ ভোল্টের বদলে ০.৫৫১৩ ভোল্ট ছিল। আর তুই… একটা থ্রেশহোল্ড সেট করতে পারছিলি না তাইতো?”
“ঠিক তাই! সামান্যতম নয়েজ—যেমন সামান্য ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশন, বা ‘ব্যাড হেয়ার ডে’-তে ওই টুপিটা পরার খারাপ স্মৃতি — স্কোরটাকে নাড়িয়ে দিচ্ছিলো। আমি আমার নিজের ০.৬০ ভোল্ট থ্রেশহোল্ড বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তুই যেই ফোনে বল্লি ‘লক্ষ্যের দিকে ফোকাস কর’, আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পারলাম। জিনিসগুলোকে রাঙ্কিং করাটা আমার লক্ষ্য ছিলনা, লক্ষ্যটা আসলে ছিল সিদ্ধান্ত নেওয়া: রেখে দেবো নাকি রাখবো না।”
আমি ১ এবং ০ লেখা দুটো ঝুড়ির দিকে ইশারা করলাম।
“ধন্যবাদ এনিগমাকে, …কারণ ও সদ্যোজাত বাছুরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ল্যাম্পটা অন-অফ করছিল। যেটা আমার চোখ খুলে দিলো। ডিজিটাল সিস্টেম ০.৫৫ ভোল্ট চেনে না। ০.৭০ ভোল্টও চেনে না। এটাই ডিজিটাল লজিকের সৌন্দর্য। ওরা শুধু দুটো স্টেবল স্টেট বোঝে: অন (১) এবং অফ (০)। মাঝখানের বাকি সব কিছুই নয়েজ। আমাকে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে খাঁটি বাইনারিতে ফেলতে হতো।”
আমি একটু পায়চারি করে, সেই মুহূর্তটাকে আবার অনুভব করে নিলাম।
“কিন্তু ১ আর ০-তে কমিট করার পরেও আর একটা প্রব্লেম দেখা দিলো। সময় কম, কাজ অনেক বেশি। আমি সব কিছু একা করার চেষ্টা করছিলাম—ইনপুট, লজিক, মেমরি, আউটপুট। আমি একাই একটা গোটা মেশিন হতে চাইছিলাম। একটা ‘ওয়ান-ওম্যান সি-পি-ইউ’। যথারীতি আমার সিস্টেম বারবার ক্র্যাশ করছিল।”
আমি বাচ্চাদের দিকে তাকালাম, যারা এখন খুব সুন্দরভাবে অর্ধবৃত্তাকারে বসে আছে।
“তখনই আমি বুঝলাম: এরা চারজন কোনো ডিস্ট্র্যাকশন বা বাধা নয়… এরা হলো একটা কম্পিউটিং ক্লাস্টার। যেকোনো কম্পিউটারে অন্তত পাঁচটি বিশেষ কম্পোনেন্ট বা অংশ থাকে যা একসাথে কাজ করে। তাই, আমি যদি একা পুরো কম্পিউটার হতে না পারি…”
আমি বিজয়ের ভঙ্গিতে আমার ক্লিপবোর্ডে টোকা দিলাম।
“…আমি একটা বানিয়ে তো ফেলতেই পারি! একটা হিউম্যান কম্পিউটার আর্কিটেকচার।”
কার্নেল হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। “তুই ঘর পরিষ্কারের একটা সাধারণ কাজকে একটা ফুল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট বানিয়ে ফেলেছিস! অবশ্য এটা তুই ছাড়া আর কেই বা করতে পারে!”
“আমি এটাকে বলি - এফিসিয়েন্সি,” আমি নাটকীয় ভাবে, আমার সদ্য-অ্যাসেম্বল করা হার্ডওয়্যারের দিকে ইঙ্গিত করে, বললাম।
➡️ পাঁচটি অপরিহার্য উপাদান
“একটা আসল কম্পিউটার আর্কিটেকচারের মতোই, আমি প্রত্যেক ভাইবোনকে একটা করে সাব-সিস্টেমের দায়িত্ব দিয়েছি। ডেডিকেটেড হার্ডওয়্যার। প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট কাজ।”

অডি: ইনপুট/আউটপুট (I/O) ডিভাইস
“অডি প্রতিটা আইটেম টেবিলে নিয়ে আসে আর রেজাল্ট সঠিক ঝুড়িতে পৌঁছে দেয়। ও হলো ইন্টারফেস — কীবোর্ড আর মনিটরের কম্বিনেশন।”
অডি বুক ফোলাল। “আমি হলাম ইন্টারফেস!”
ফ্লপি: মেমরি ইউনিট (MU)
“আমি ফ্লপিকে রুল-বুক বা নিয়মাবলি দিয়েছি। সে ডেটা (জিনিসপত্র) আর ইনস্ট্রাকশন (নিয়ম) স্টোর করে রাখে। মেমরি ইউনিট ছাড়া কোনো সিস্টেমই কাজ করে না—এমনকি আমিও না।”
ফ্লপি চশমা ঠিক করল। “ডেটা ইন্টিগ্রিটি খুব জরুরি, কার্নেল দাদা।”
কোডেক্স এবং এনিগমা: অ্যারিথমেটিক লজিক ইউনিট (ALU)
“এরা দুজন আমার ALU। এনিগমা অ্যারিথমেটিক ইউনিট — হিসাব নিকাশ আর স্কোরিং। কোডেক্স লজিক ইউনিট — ফাইনাল ট্রু/ফলস্ (True/False) ইভ্যালুয়েশন অর্থাৎ লজিকাল ডিসিশন। একসাথে, তারা ইনপুট নেয় এবং একটা পরিষ্কার ১ বা ০ আউটপুট দেয়।”
কোডেক্স আর এনিগমা একসাথে চেঁচিয়ে উঠল: “আমরাই লজিক গেট!”
আর আমি—নোভী: কন্ট্রোল ইউনিট (CU)
“আমি হলাম CU। আমি ফ্লপির (MU) থেকে ইনস্ট্রাকশন জেনে নি (fetch), সেটা ডিকোড করি, অডিকে নির্দেশ দিই, এবং কোডেক্স এবং এনিগমা (ALU)-কে হিসাব করতে বলি। আমি পুরো সিস্টেমটাকে ছন্দবদ্ধভাবে পরিচালনা করি।”
আমি কমান্ডারের মতো মাথা নাড়লাম।
🎬 উপসংহার: একটি পরিষ্কার ব্যবস্থা
“তো, এই হলো ব্যাপারটা, কার্নেল,” হাত ঘুরিয়ে প্রায় ঝকঝকে ঘরটার দিকে ইশারা করে, আমি বললাম। “এটা ‘বিশ্লেষণ কম, কাজ বেশি’-র জন্য হয়নি। হয়েছে কারণ আমি সমস্যাটা ঠিকঠাক বিশ্লেষণ করেছি, অস্পষ্টতাকে বাইনারিতে নামিয়েছি, আর কাজটা নির্ভরযোগ্যভাবে চালানোর জন্য একটা মডুলার আর্কিটেকচার বানিয়েছি।”
কার্নেল লম্বা, নাটকীয় একটা নিশ্বাস ফেলল। তবু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসিটা লুকোতে পারল না।
“তুই,” আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে, সে ধীরে ধীরে বলল, “একটা সাদামাটা ঘর পরিষ্কারের কাজ নিয়ে… পুচকে বাচ্চাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আস্ত একটা CPU-তে পরিণত করলি?… আর নিজের শোবার ঘরে ভন নিউম্যান আর্কিটেকচার বানিয়ে ফেললি!”
তারপর একবার মাথা ঝাকিয়ে না চাইতেও হেসে ফেলল। “ঝাঁটা হাতে না তোলার — এটাও একটা উপায় বটে।”
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম—একদম সেই আত্মতৃপ্ত শান্ত ভাব নিয়ে, যেটা তখনই আসে যখন কোনো সিস্টেম ০% এরর রেটে চলে।
“নিজের মুখে আর কী বা বলব? কেউ পরিষ্কার করে। আর আমি ডিজাইন করি।”
আমাদের পেছনে, কোডেক্স আর এনিগমা বিজয়ী লজিক গেটের মতো হাই-ফাইভ করল। ফ্লপি ধর্মগ্রন্থের মতো বুকের কাছে চেপে ধরল তার রুলবুকটা। আর অডি গর্বের সঙ্গে পাহারা দিচ্ছিল দুটো ঝুড়ি—১ আর ০— যেগুলো এখন নিখুঁত, নয়েজ-ফ্রি সিদ্ধান্তে ভরা।
ডিপ্লয়মেন্ট স্ট্যাটাস: সাকসেস
দিনের শেষে আমরা দেখতে পেলাম —
- একটা পরিষ্কার ঘর
- চারজন তৃপ্ত মিনি-ইঞ্জিনিয়ার
- কার্নেল তার জীবনের সব সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবছে
- আর আমি — গর্বের সঙ্গে নোটবুকে পুরো ঘটনাটা ডকুমেন্ট করছি
সত্যিই, একেবারে সফল একটা ডিপ্লয়মেন্ট।