ব্লক যখন নিখোঁজ আর কার্নেল যখন ‘ক্র্যাশ’ করার মুখে
Fri Jan 09 2026

🏛️ নকশা ছাপার কাঠের ব্লক - নিখোঁজ রহস্য
বিশাল হলঘরটায় ঢুকেই দেখলাম যেন এক এলাহি ব্যাপার — চারিদিকে আলো ঝলমল করছে, বিচারকদের গম্ভীর মুখ, আকাশচুম্বী অট্টালিকার মতো স্তূপ করে রাখা কাপড়ের থান, আর সামরিক শৃঙ্খলায় সাজানো সার সার ছাপার টেবিল। সব মিলিয়ে এক টানটান উত্তেজনা; প্রতিযোগীরা সব অভিজ্ঞ জাদুকরের মতো আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের সরঞ্জাম বের করছে, যেন এখনই কোনো অলৌকিক খেলা দেখাবে।
আমার অবশ্য শুরুতেই চোখ পড়লো বাগির দিকে।
ছোট একটা ভিড় তাকে ঘিরে রেখেছে; নিজের দলের সদস্য আর উৎসাহী কজন সাংবাদিকদের কাছে গর্বের সাথে সে প্রদর্শন করছে তার নিখুঁত কারুকাজ করা দশটা নকশার ব্লক। ওই নিখুঁত সরঞ্জামগুলো দূর থেকে ঝলমল করছিলো আর আমার বুকের ভেতর চেনা একটা ভয়ের চোরা স্রোত অনুভব হচ্ছিলো।
আমার কানের কাছে ঝুঁকে এল কার্নেল, আর শান্ত স্বরে বলল,
“চিন্তা করিস না নোভী। তোর কাছেও তো দশটাই আছে। তুইও সমান দক্ষ।”
আমি কোনোমতে একটু ম্লান হাসলাম, তারপর হাত বাড়ালাম আমার চামড়ার থলেটার দিকে। বিশ্বাস ছিল, ভিতরে আমার দশটা আস্ত নকশার ব্লকের পরিচিত ষ্পর্শ অনুভব করবো।
কিন্তু পরিবর্তে—
বিস্ময়। নিস্তব্ধতা। আর তারপর আতঙ্ক।
থলের ভেতর আমার হাত খুঁজে পেল মাত্র দুটো নকশার ব্লক।
- একটাতে ছোট ছোট বিন্দু (ডট) দেওয়া নকশা।
- অন্যটায় একটা আঁকাবাঁকা (জিগজ্যাগ) খাঁজ।
বাকিগুলো — আমার অতি আদরের সেই আটটা ব্লক — উধাও।
কার্নেল সাথে সাথেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল,
“এ তো মেনে নেওয়া যায় না! আমাদের এখনি অভিযোগ জানানো উচিত! হিসাব অনুযায়ী তোর জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই — দুই বনাম দশ — এ তো নিশ্চিত পরাজয়!”
বুকের ভেতর ভারী একটা পাথর চেপে বসার মতো অনুভূতি হলো। তাড়াহুড়োয় ব্লক গুলো কোথাও ফেলে এসেছি, নাকি কেউ ব্যাগে হাত দিয়েছে—এখন আর সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সময় ফুরিয়ে আসছে।
🔍 আমার উন্মত্ত খোঁজ
কার্নেলের কথা কানে না তুলে আমি হন্যে হয়ে খোঁজা শুরু করলাম—যা রীতিমতো অস্বস্তিকর আর বিশ্রী পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
কোথায় না খুঁজেছি আমি:
- টেবিলের নিচে
- পর্দার আড়ালে
- প্রত্যেকটা পকেটের ভেতরে
- ব্যাগটা উল্টে সব জিনিস মেঝেতে ছড়িয়ে
- এমনকি ব্যাগের এমন সব চোরা কুঠুরিগুলোও পরীক্ষা করলাম যেগুলোর অস্তিত্বের কথা আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম
প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথে আমি আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ছিলাম।
কার্নেল, যে বরাবরই কঠোরভাবে যুক্তিনির্ভর ঠিক একটা ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’-এর মতো মন্তব্য করল:
“স্টাটিস্টিক্যালি, একটা ব্যর্থ তল্লাশি প্রক্রিয়া বার বার চালালে ফলাফল পরিবর্তন হয় না।”
“কার্নেল, এখন একদম চুপ থাক।” দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে, নিচুস্বরে বললাম আমি।
ফোনটা তুলে আমার সবচেয়ে গোছানো বন্ধুকে মেসেজ করলাম:
“ফোনটা হাতে নিয়ে আমার সবচেয়ে পরিপাটি বন্ধুটাকে মেসেজ পাঠালাম: “শোন, এখনই ভেন্যুতে ৮টা ডিজাইনের ব্লক নিয়ে আসতে পারবি?? যেকোনো ডিজাইন?? যা হোক কিছু একটা?? প্লিজ প্লিজ!”
উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে:
“তোর কেন মনে হচ্ছে যে আমার কাছে কাপড় ছাপানোর ডিজাইনের ব্লক থাকবে???”
মাথাটা পেছন দিকে এলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকালাম; ওপরের উজ্জ্বল আলোতে নিজের অনুশোচনা টা আরো স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
এরপর মরিয়া হয়ে ‘ইনস্ট্যান্ট ডেলিভারি’ অ্যাপগুলোতে হানা দিলাম:
- “pattern stamp"
- "cloth printing design blocks"
- "block printing tool urgent"
- "any stamp pls pls pls express delivery???”
প্রতিটা সার্চ ফিরিয়ে দিল সেই একই বিদ্রূপাত্মক বার্তা:
No matching items found.
কার্নেল আবার সেই বিরক্তিকর শান্ত গলায় বলে উঠল:
“নোভী, আমাদের অভিযোগ জানানো উচিত। এটা নিয়মমাফিক সমাধান করার মতো সমস্যা।"
"কার্নেল, হেল্পডেস্কের মতো কথা বলা বন্ধ করবি?”
সবশেষে চরম মরিয়া হয়ে ব্যাকস্টেজ থেকে হাবিজাবি কয়েকটা জিনিস তুলে নিলাম - বোতলের ঢাকনা, চাবির রিং, একটা মেটাল ক্লিপ, একটা জরাজীর্ণ রাবার ব্যান্ড। কালি মেখে চাপ দিলাম, অন্তত সামান্য ব্যবহারযোগ্য প্যাটার্নের আশায়।
না। প্রতিটি চেষ্টাই একটা নতুন স্বাদের হতাশা নিয়ে এল।
শেষমেশ চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লাম, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল, গলা চিরে কেবল একটা অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল:
“আজকেই কেন এমন হতে হলো…”
💡 দ্বিমূল সন্ধিক্ষণ
ক্লান্ত এবং অদৃশ্য মানসিক চাপে জর্জরিত হয়ে আমিব্যাকস্টেজের এক সরু করিডোর দিয়ে টলতে টলতে গিয়ে একটি দেয়ালের গায়ে এলিয়ে পড়লাম। দূর থেকে ভেসে আসা ভিড়ের গর্জন আর বাগির ডিজাইন শুরুর সেই আত্মবিশ্বাসী ‘ধপ-ধপ’ শব্দটা যেন আমার সর্বনাশের কাউন্টডাউন করছিল।
তারপর হঠাৎ।
একেবারে লাইটবাল্ব মুহূর্ত।
পাশের গ্যালারিতে কেউ সুইচ টিপতেই, উজ্জ্বল আলো গিয়ে পড়ল এক দেয়ালে টাঙানো এক বিমূর্ত শিল্পকর্মে।
আমি থমকে গেলাম।
সেই নকশাটা — কিছু সরল জ্যামিতিক অবয়ব পুনরাবৃত হচ্ছে, প্রসারিত হচ্ছে, আর এক জটিল আবর্তে ছড়িয়ে পড়ছে — যেন কুয়াশার বুক চিরে বেরিয়ে আসা কোনো হাত আমাকে হতাশার গর্ত থেকে টেনে তুলল।
কার্নেল, উদ্বিগ্ন ছায়ার মতো আশেপাশে ঘুরঘুর করতে করছিলো, নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল:
“নোভী…?”
আমি ছবিটা থেকে চোখ সরালাম না।
এক অবিশ্বাস্য হাসি ধীরে ধীরে আমার মুখে ফুটে উঠল।
“ঠিক ধরেছি!
এটাতো প্রাচুর্য থেকে তৈরি হয়নি…
এটার ভিত্তি হলো ‘বেস’ আর ‘পজিশন’।
ডেসিমাল পদ্ধতিতে এটা হয়।
বাইনারিতেও এটা হয়।
বেসটা সীমা নয় — আসল হলো কৌশল।“
কার্নেল মাথাটা কাত করে গভীর উদ্বেগ নিয়ে বলল:
“বাইনারি? আমরা কি এখন কম্পিউটার নিয়ে আলোচনা করছি? এটা তো কাপড় ছাপানোর প্রতিযোগিতা, নোভী। তুই এখানে ফোকাস কর।“
আমি ওকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলাম; — আতঙ্কের জায়গাটা ততক্ষণে দখল করে নিয়েছে একটা রোমাঞ্চকর উত্তেজনা।
“বাগি ডেসিমালে কাজ করছে, কার্নেল।
কিন্তু আমি…
আমি যাব বাইনারিতে!
এটা একটা দার্শনিক উত্তরণ”
কার্নেলের দুশ্চিন্তা এবার চরমে পৌঁছাল।
“নোভী, তোর কথার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। আর শোন, ফাইনালিস্টদের মঞ্চে ডাকছে!”
আমি বিড়বিড় করে নিজেকেই বললাম:
“হ্যাঁ… ডট ডট, ডট জিগজ্যাগ, জিগজ্যাগ ডট, জিগজ্যাগ জিগজ্যাগ…”
কার্নেল কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ততক্ষণে আমি হাঁটা লাগিয়েছি।
থলেটা হাতে নিলাম, একলা পড়ে থাকা ওই দুটো ব্লক শক্ত করে ধরলাম, আর মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলাম —
বুক ধুকপুক করছে,
মাথায় চিন্তার ঢেউ,
অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অদম্য জেদ নিয়ে আমি প্রস্তুত।
😨 কার্নেলের এক মিনিটের বিপর্যয়
(এই ফাঁকে কর্নেলের ওদিকে…)
কার্নেলের একটা খারাপ অনুভূতি হচ্ছিল। সেই ধরনের অনুভূতি — যা পেটের ভেতর কোনো একটা ডকুমেন্ট না করা বাগ-এর মতো জেঁকে বসেছে আর কিছুতেই সরছে না।। সে দ্রুত ব্যাকস্টেজ থেকে বেরিয়ে দর্শকের সারির দিকে ছুটল; মানুষের ভিড় ঠেলে এমন একটা জায়গা খুঁজে নিল যেখান থেকে মঞ্চটা পরিষ্কার দেখা যায়।
সে যা দেখল, তাতে তার বুক ধক করে উঠল।
নোভি দাঁড়িয়ে আছে স্টেজের একদম মাঝখানে — নির্দয় সাদা আলোর নিচে — সম্পূর্ণ স্থির।
- না কোনো সরঞ্জাম ঠিক করছে।
- না বিচারকদের অভিবাদন জানাচ্ছে।
- না নকশা শুরু করছে।
- শুধু… জড় পদার্থের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করে কিছু বলছে।
কার্নেল সামনের দিকে ঝুঁকে এল, নোভীর কথাগুলো শোনার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
”…ডট ডট… ডট জিগজ্যাগ… জিগজ্যাগ ডট…"
"এটা আবার কী…!” দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল কার্নেল।
বিচারকরা একে অপরের দিকে চিন্তিত মুখে তাকাচ্ছিলেন।
বাগি এমনভাবে হাসল, যেন জয়ের ভাষণ আগেই খসড়া করে ফেলেছে।
দর্শকদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
লজ্জায় আর অস্বস্তিতে কার্নেল যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
এই তো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এটাই সেই মেন্টাল ব্রেকডাউন। লাইভ অডিয়েন্সের সামনে মেয়েটা পুরোপুরি বিমূর্ত দর্শনে ঢুকে পড়েছে।
পুরো একটা মিনিট নোভী সেভাবেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
পুরো একটা মিনিট!
প্রতিযোগিতার সময় হিসেবে — এক অনন্তকাল।।
কার্নেল আর বসে থাকতে পারল না। লজ্জার তীব্রতা এখন এতটাই বেড়েছে যে তার মেরুদণ্ড পর্যন্ত শিহরিত হয়ে উঠছে। সে হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল।
এবার তাকে ব্যাকস্টেজে যেতেই হবে।
কাউকে না কাউকে তো নোভীকে মঞ্চ থেকে আলতো করে সরিয়ে নিয়ে আসতে হবে, নাহলে খুব শীঘ্রই কোনো এক ‘টেড টক’-এ, পাবলিক ব্রেকডাউনের উদাহরণ হয়ে যাবে ও।
কিন্তু ঠিক যখনই সে ঘুরে দাঁড়াল —
নোভী নড়ে উঠল।
আর সাথে সাথে কার্নেলও স্থির হয়ে গেল।
নোভীর হাতটা কালিতে ডুবল। স্ট্যাম্প!
ডট—পরিষ্কার, তীক্ষ্ণ, আত্মবিশ্বাসী।
তারপর দ্বিতীয় ব্লক। স্ট্যাম্প।
জিগজ্যাগ।
তারপর দুটোই—দ্রুত, সাবলীল কম্বিনেশন, যা কিছুক্ষণ আগেও আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকা কারোর পক্ষে করা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। ডট-ডট। ডট-জিগ। জিগ-ডট। জিগ-জিগ। বারবার—প্রতিটি সিকোয়েন্স একটি নতুন এবং স্বতন্ত্র মোটিফ তৈরি করছিল।
ছন্দবদ্ধ। সুপরিকল্পিত।
মনে হচ্ছিল ও ডিজাইন করছে না—সুর বাঁধছে।
দর্শকরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
বিচারকরা এতটা সামনে ঝুঁকে পড়লেন যে একজন প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন।
বাগি মাঝপথে থমকে দাঁড়ালো, তার মুখে ফুটে উঠল চরম অবিশ্বাস।
কার্নেল ধীরে ধীরে আবার বসে পড়ল, তার মুখ হাঁ হয়ে গেল।
আটটা নিখোঁজ ডিজাইন ব্লক।
দুটো ছোট্ট সরঞ্জাম।
আর নোভি তৈরি করছে এত বৈচিত্র্য, এত গভীরতা, এত মৌলিকতা—যা সে আগে কখনও দেখেনি, এমনকি রিহার্সালেও না।
তার সব লজ্জা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল, আর এক অভূতপূর্ব বিস্ময়ের কাঁটা দিয়ে উঠল সারা শরীরে।

নোভী নিশ্চল হয়ে যায়নি।
নোভী আতঙ্কিত ছিল না।
ও আসলে হিসেব করছিল।
ও পরিকল্পনা করছিল।
ও… খেলার মোড় বদলে দিচ্ছিল।
কার্নেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল — যাতে মিশে ছিল স্বস্তি আর বিস্ময়।
“এই মেয়েটা,” সে নিচু স্বরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “আমার চুল সব পাকিয়ে ছাড়বে!”
🧩 ব্যাকস্টেজ — রহস্যের আংশিক উন্মোচন
স্টেজ থেকে নামার পর, আমার এদিকে…
আমি মঞ্চ থেকে নামামাত্রই কার্নেল প্রায় দৌড়ে ব্যাকস্টেজে এল। ওর ভেতরের সিস্টেমগুলো যে একেবারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল, সেটা আমি টের পাচ্ছিলাম।
আমি খুব শান্তভাবে আর তৃপ্তির সাথে আঙুল থেকে কালির দাগ মুছছিলাম। অন্যদিকে কার্নেলকে দেখে মনে হচ্ছিল ও এইমাত্র একসাথে সাত-সাতটা অস্তিত্ব সংকটের ওপর দিয়ে দৌড়ে এসেছে।
ও সোজা আমার দিকে এগিয়ে এল।
“নোভী। তাড়াতাড়ি বলে ফেল।“
আমি নিরীহভাবে চোখ পিটপিট করলাম। “কী বলব?”
কার্নেল হাত-পা নেড়ে মঞ্চের দিকে ইশারা করল।
“ওই— ওই যে জিনিসটা তুই মাত্র করলি! ওই প্যাটার্ন বিস্ফোরণ! ওই নকশার বিস্ফোরণ! তোর কাছে মাত্র দুটো ব্লক ছিল! দুটো! তুই অতগুলো বৈচিত্র্য কিছুতেই তৈরি করতে পারতিস না, যদি না তোর — “
ও একটু থামল।
” — তোর ওপর অলৌকিক কোনো আত্মা ভর করত।“
আমি ফোঁস করে হাসলাম। “কার্নেল, প্লিজ। আমার ওপর আত্মা ভর করলে প্যাটার্নগুলো সিমেট্রিক হত।"
"তাহলে ওটা কী ছিল?”
আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে কালি-মাখা থলিটা ধরলাম।
“বাইনারি।“
কার্নেল চোখ পিটপিট করল। “বাইনারি… মানে… কম্পিউটার বাইনারি? ০ আর ১? নোভী, এটা কাপড়ের প্রতিযোগিতা। তুই তো আর কাপড়ের ওপর হ্যাকিং করিসনি!"
"আসলে,” আমি হেসে বললাম, “একটু করেছি।“
ও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুটো ব্লক তুলে ধরলাম।
“এটা ডট। এটা জিগজ্যাগ,” আমি বললাম।
“দুটো সিম্বল, কার্নেল। শুধু দুটো।“
কার্নেল হাত ভাঁজ করল। “সংখ্যাটা আমার জানা।"
"আর ওই দুটোই যথেষ্ট,” আমি বললাম।
“ডট-ডট।"
"ডট-জিগ।"
"জিগ-ডট।"
"জিগ-জিগ।“
আমি জাদুর কৌশল দেখানোর মতো হালকা করে ব্লকগুলো টোকা দিলাম।
“দুটো সিম্বল থেকে চারটা প্যাটার্ন। আর সিকোয়েন্স রিপিট করলে…"
"…অসীম সম্ভাবনা।“
“এক মিনিট। ওটা বাইনারি ছিল? তুই কাপড় ছাপতে বাইনারি ব্যবহার করলি?”
আমি মাথা নাড়লাম। “হ্যাঁ।"
"এটা… এটা অসম্ভব!"
"কিন্তু কার্যকর,” আমি মিষ্টি করে বললাম।
কার্নেল মুখ খুলল, আবার বন্ধ করল, তারপর আবারও খুলল।
“আমি ঠিক পুরোপুরি বুঝতে পারছি না,” কপালে হাত ঘষতে ঘষতে ও স্বীকার করল। “তুই জানলি কী করে কোথায় বসাতে হবে? সিকোয়েন্সগুলো সাজালি কী করে? আর কীভাবে — ”
আমি ওকে মুখ চেপে চুপ করিয়ে দিলাম।
“কার্নেল,” হেসে বললাম আমি,
“এটা ছিল আংশিক ব্যাখ্যা। বাকিটা বাড়ি গিয়ে পাবি। এখন—”
আমি আমার কালিমাখা হাতদুটো তুললাম।
” — আমার সাবান দরকার। আর কিছু খাবার।“
কার্নেল মাথা নাড়ল, এই মুহূর্তে ও যেমন কৌতূহলী, তেমনি অভিভূত।
আর ও একটা জিনিস নিশ্চিতভাবেই জানত:
মঞ্চে আমি যে কেরামতিই দেখিয়ে থাকি না কেন…
সে তার অর্ধেক সত্যও এখনো জানতে পারেনি।
🏠 বাড়িতে — রহস্যের পূর্ণ উন্মোচন
বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে শরীরের শেষ অ্যাড্রেনালিনটুকুও কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে এক চরম ক্লান্তি ভর করল। কালি-মাখা থলিটা টেবিলে ছুড়ে জুতো খুলে সোফায় ধপ করে বসে পড়লাম—একটা দুমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের নৌকার মতো।
কার্নেল আমার পেছন পেছন ভেতরে এল। — ওর মুখে এখনো সেই একই অভিব্যক্তি যা ব্যাকস্টেজে ছিল: “আমি না বোঝা পর্যন্ত ঘুমোব না।”
টেবিলের ওপর দু-গ্লাস জল রাখল।
“নোভী,” আমার পাশে বসতে বসতে ও বলল, “আমি যথেষ্ট ধৈর্য ধরেছি। কিন্তু এখন আমার পুরো ব্যাখ্যাটা চাই। কোনো কাব্যিক আধা-খেঁচড়া উত্তর চলবে না। আজ আসলে কী হয়েছিল?”
আমি নাটকীয়ভাবে গোঙালাম।
“যা, হোয়াইটবোর্ডটা নিয়ে আয়।“
কার্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হোয়াইটবোর্ডের কি দরকার?"
"কার্নেল!"
"…আচ্ছা, আনছি।“
মাঝরাতে আইডিয়া নিয়ে কাজ করার জন্য আমি যে ছোট ফোল্ডিং বোর্ডটা ব্যবহার করি, ও সেটা টেনে নিয়ে এল। আমি উঠে বসলাম, আঙুল মটকালাম, আর বোর্ডে বড় বড় করে দুটো চিহ্ন আঁকলাম:
• (ডট)
/// (জিগজ্যাগ)
“এই দুটো,” আমি বললাম, “হলো আমার ০ আর ১।“
কার্নেল ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
আমি চালিয়ে গেলাম,
“তুই দেখলি না আমি এলোমেলো স্ট্যাম্প দিচ্ছি? ওগুলো মোটেও এলোমেলো ছিল না। আমি আসলে সিকোয়েন্স তৈরি করছিলাম।“
আমি লিখলাম:
ডট ডট
ডট জিগ
জিগ ডট
জিগ জিগ
”দুটো ডিজাইন ব্লক → চারটে নকশা।
আরও একটা রিপিটেশন যোগ করলে → আটটা।
তারপর ষোলটা।
তারপর বত্রিশটা।
এটা হলো ‘এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ’ বা সূচকীয় বৃদ্ধি।“
কার্নেল সোফার পেছনে হেলান দিল, ওর মুখটা বিস্ময়ে সামান্য হাঁ হয়ে গেছে।
“কাপড়ের ওপর বাইনারি… আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুই ওটা তাৎক্ষণিকভাবে করে ফেললি!”
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। “বাইনারি আসলে খুব… স্বস্তিদায়ক। মাত্র দুটো সিম্বল। কিন্তু সম্ভাবনা অসীম, যদি তুই সঠিক পজিশন বা বিন্যাস জানিস।“
এরপর আমি তিনটে কলাম আঁকলাম:
| বাইনারি | অক্টাল | হেক্সাডেসিমাল |
|---|---|---|
| বেস ২ (০, ১) | বেস ৮ (০-৭) | বেস ১৬ (০-F) |
“বাইনারি সবচেয়ে সহজ।
যদি আমার কাছে আটটা ডিজাইন ব্লক থাকত?
ওটা হতো অক্টাল পদ্ধতিতে চলে যাওয়ার মতো।“
আমি আটটা আঙুল তুলে দেখালাম।
“আটটা চিহ্ন → আরও অনেক বেশি কম্বিনেশন 8n.
বেস বদলালে কাজের গতি বাড়ে, কিন্তু অসীম হওয়ার ক্ষমতাটা সব পদ্ধতিরই থাকে।"
"আর ষোলটা ব্লক থাকলে?” কার্নেল বলল,
“হেক্সাডেসিমাল,” আমি হাসলাম।
“ষোলটা সিম্বল।
সবকিছু তখন মারাত্মক দক্ষ হয়ে যায়।
এই কারণেই প্রোগ্রামাররা এটা এত ভালোবাসে।“
কার্নেল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“তুই বলতে চাইছিস সংখ্যা পদ্ধতি আসলে পরিমাণের খেলা নয়। এটা আসলে কাঠামোর খেলা।”
“একদম!” আমি খুশিতে টেবিলে একটা চাপড় মারলাম।
“এটাই তো আসল পয়েন্ট! বাগি কাজ করছিল ডেসিমল চিন্তাধারা নিয়ে। ও দশটা ব্লক মানে দশটা আলাদা অপশন ভেবেছিল।
আর আমার কাছে মাত্র দুটো ব্লক ছিল, কিন্তু আমি ব্যবহার করেছি কৌশল, পরিমাণ নয়।”
কার্নেল চুপচাপ বসে কথাগুলো হজম করতে লাগল।
আমি কিছুটা নরম স্বরে বললাম।
“দেখ কার্নেল… জীবনেও কিন্তু এটাই সত্যি।“
আমি মার্কারটা নামিয়ে রেখে হাত জোড় করলাম।
“মাঝে মাঝে আমরা অন্য কারোর দিকে তাকিয়ে ভাবি তাদের কাছে কত কিছু আছে—বেশি সরঞ্জাম, বেশি সুযোগ, বেশি সুবিধা।”
আমি বোর্ডের দিকে আঙুল দেখালাম।
“কিন্তু হতে পারে তারা কেবল এমন একটা পদ্ধতি বা সিস্টেম ব্যবহার করছে যা আমরা এখনো বুঝতে পারিনি।”
কার্নেল চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল।
“আমরা ভাবি তারা অসীম,” আমি বলতে থাকলাম, “কিন্তু তা নয়। তারা কেবল একটা প্যাটার্ন বা ছক কাজে লাগাচ্ছে। একটা পদ্ধতি। একটা কৌশল।“
আমি সোফার কুশনে হেলান দিলাম।
“যখন আমরা সেই কৌশলটা শিখে ফেলি—সেটা বাইনারি হোক, অক্টাল হোক বা হেক্সা—হঠাৎ করে… আমাদের আর কোনো সীমাবদ্ধতা থাকে না। আমরা বুঝতে পারি আমাদের বেশি উপকরণের প্রয়োজন ছিল না। আমাদের প্রয়োজন ছিল নতুন একটা দৃষ্টিভঙ্গির।”
কার্নেলের ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“আর আজ,” সে নিচু স্বরে বলল, “তুই প্রমাণ করলি যে দশটার বিরুদ্ধে মাত্র দুটো ডিজাইন ব্লকও রুখে দাঁড়াতে পারে।“
আমি আলতো করে হাসলাম।
“কার্নেল, সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানলে দুটো ডিজাইন ব্লক যেকোনো কিছুর বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়াতে পারে।”
আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম, ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।
কার্নেল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যাতে প্রশংসা আর ক্লান্তি দুই-ই মিশে ছিল।
“যাই হোক,” সে বিড়বিড় করে বলল, “এখন বুঝলাম আমার কেন চুল পাকছে।”
“খুব ভালো,” আমি উজ্জ্বল মুখে বললাম।
“কারণ কাল? কাল আমরা ‘ইমাজিনারি নাম্বার’ (কাল্পনিক সংখ্যা) দিয়ে চেষ্টা করব।”
কার্নেল বালিশে মুখ গুঁজে গুঙিয়ে উঠল।
কিন্তু মনে হলো যেন ও হাসছিলো।